• বৃহস্পতিবার ১৩ জুন ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪৩১

  • || ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

‘কালবৈশাখী’র তান্ডব কেড়ে নিয়েছে হাসি খাতুনের মুখের হাসি’

প্রকাশিত: ৩১ মে ২০২৪  

“ঝড়ে বাড়ীঘর সব উড়ে গেছে। দু’দিন থেকে আছি খোলা আকাশের নীচে। রাতে বৃষ্টিতে ভিজেছি। হাতের কাছে খাবারের কিছুই নেই। স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে দু’দিন থেকে একপ্রকার না খেয়েই আছি। গতরাতে এক আত্মীয় কিছু খাবার দিয়ে গিয়েছিলো, সেগুলোই কোনমতে খেয়ে আছি। এমন অবস্থায় থাকলেও মেয়র—কমিশনার বা প্রশাসনের কেউ আমাদের খেঁাজ নিতে আসেনি”।

শুক্রবার (৩১ মে) দুপুর ১২টায় এই প্রতিবেদকের কাছে বিমর্ষ হয়ে এমন কথাই বলছিলো দিনাজপুর পৌর এলাকার ইসলামবাগ মহল্লার রেললাইন বস্তির হাসি খাতুন (৩১)। স্বামী শহিদুল ইসলাম করে রডমিস্ত্রির কাজ, আর হাসি বেগম পাশ^বর্তী কাচারীতে পানের দোকানে পান বিক্রি করেন। স্বামী—স্ত্রীর এই আয় নিয়েই চলতো তাদের চার সন্তানের পরিবার। জমা থাকতো না কিছু। নামও হাসি, আর কাচারীতে হাসিমুখে পান বিক্রি করায় সবাই তাকে হাসি আপা নামেই চেনে। কিন্তু গত বুধবার দিবাগত রাতের কালবৈশাখী’র তান্ডব তার সেই মুখের হাসি যেনো কেড়ে নিয়ে গেছে। মাথা গোঁজার ঠাইটুকু একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ায় এখন উদ্বেগ—আর উৎকন্ঠার মধ্যে বিমর্ষ তার মুখায়ব। ঝড়ে সব উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ায় এখন বাড়ীর চারিদিকের টিনের বেড়া ছাড়া মাথার উপরে আর কিছুই নেই। হাসি বেগম বলেন—সামনের দিনগুলোতে কিভাবে চলবো, বাড়ীটুকুই বা কিভাবে ঠিক করবো? কেউ তো কোন সাহায্য করছে না।

হাসি খাতুনের মতো অবস্থা ইসলামবাগ এলাকার প্রায় ৩০/৩৫টি পরিবারের। পাশ্ববর্তী মজিরণ (৫০) ও তার স্বামী মোঃ চান্দু বলেন, চায়ের দোকান করে সংসার চলতো তাদের। ঝড়ে সব উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন চায়ের দোকানও করতে পারছে না, আর বাড়ীতেও থাকার মতো অবস্থা নেই। একই এলাকার রুবিনা খাতুন বলেন, বড়ার দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করেন পরিবারসহ তিনি। ঝড়ে তার সব কেড়ে নিয়েছে। মাথা গোজার ঠাইটুকুও এখন আর বাস করার মতো নেই।

পাশ্ববর্তী দক্ষিন বালুবাড়ী এলাকার অধিবাসী ওবায়দুল ইসলাম (৫১) বলেন, বড়মাঠে কোপ্তার দোকান করেন তিনি। রিক্সাভ্যানে ভ্রাম্যমান দোকানের নাম চাপ মামা—ভাগিনা কোপ্তার দোকান। কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে তার ভ্যানের দোকানটিও বিধ্বস্ত। বাড়ীঘরও ভেঙ্গে গেছে। এখন চলবে কি করে। ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সাহায্য তো দুরের কথা, এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের খোঁজখবর নিতে আসে নাই।

গত বুধবার দিবাগত রাতে ৫ মিনিটের কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার  ঘরবাড়ী, উপড়ে ও ভেঙ্গে গেছে হাজার হাজার গাছ, ভেঙ্গে গেছে ও হেলে পড়েছে শতাধিক বিদ্যুতের খুটি। ফলে বিদ্যুৎহীন রয়েছে দিনাজপুর জেলা। এছাড়াও আম, লিচু ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সল রায়হান জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে শুধুমাত্র দিনাজপুর সদর উপজেলার ১২’শ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপড়ে ও ভেঙ্গে গেছে এই উপজেলার ৮ হাজার গাছ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭০টি বিদ্যুতের খুটি। সদর উপজেলা ছাড়াও দিনাজপুরের বিরল, বোচাগঞ্জ, কাহারোল, বীরগঞ্জ, চিরিরবন্দর, খানসামা, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক হাজার ঘরবাড়ী, উপড়ে ও ভেঙ্গে পড়েছে কয়েক হাজার গাছ, আম, লিচুসহ বোরো ও ভুট্টা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

দিনাজপুর জেলা শাকিল আহমেদ জানান, ইতিমধ্যে বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কের গাছ সরিয়ে যানচলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ৫’শ প্যাকেজ শুকনো খাবার, ৩৫ টন চাল, ১০ বান্ডিল টিন ও নগদ ৩০ হাজার টাকা  বিতরণ করা হয়েছে। ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ঝড়ের একদিন পরেও গতকাল শুক্রবার দিনাজপুরের বেশীরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হয়নি। ফলে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় চরম দুর্ভোগে রয়েছে মানুষ। এদিকে ঝড়ে দিনাজপুর জেলায় শতাধিক বৈদ্যুতিক খুটি ভেঙ্গে যাওয়ায় ও হেলে পড়ায় বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে দিনাজপুর।

নর্দার্ণ ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানী—নেসকো’র নির্বাহী প্রকৌশলী স্পন্দন বসাক জানান, ঝড়ে ১১ হাজার ভোল্ট লাইনের ১২টি খুটি ভেঙ্গে গেছে এবং ১৪টি খুটি হেলে পড়েছে। এছাড়াও ৪৪০ ভোল্ট লাইনের ৩৩টি খুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে বিদ্যুতের তার ছিড়ে পড়েছে। ফলে গোটা দিনাজপুরে বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎ সরবরাহ। তবে জরুরী ভিত্তিতে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ শহরের কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়েছে। দিনাজপুরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে দু—একদিন সময় লাগবে বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

– দিনাজপুর দর্পণ নিউজ ডেস্ক –