• মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪৩১

  • || ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪৫

দিনাজপুরের আওকরা মসজিদের ২৫৮ বছর   

প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২৪  

উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক নিদর্শনের জেলা দিনাজপুর। যেসব ঐতিহ্যবাহী পুরনো স্থাপনা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম খানসামা উপজেলার প্রায় ২৫৮ বছরের পুরনো আওকরা মসজিদ। এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের পাকেরহাট গ্রামের সীমান্তে হাসিমপুর এলাকার বুকচিরে বয়ে চলা বেলান নদীর তীরে মির্জার মাঠ নামক স্থানে অবস্থিত।

এটির নামকরণের পেছনে রয়েছে অলৌকিক ইতিহাস। প্রাচীন এ মসজিদকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা কথা। ‘আওকরা’ শব্দের অর্থ কথা বলা। জনশ্রুতি আছে, এই মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কথা বললে প্রতিধ্বনি হতো। তাই স্থানীয়রা মসজিদটির নাম রাখেন ‘আওকরা’ বা কথা বলার মসজিদ। তবে নির্মাণের সময় মসজিদটি কি নামে পরিচিত ছিল তা স্থানীয়দের কেউ বলতে পারেননি।

জানা যায়, এক সময় মসজিদের আশপাশে ছিল মুসলিম জনবসতি। মির্জা লাল বেগ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কথা ভেবে ১৭৬৬ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হতো। এই মসজিদকে ঘিরে মির্জার মাঠেই একটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আওকরা নামে স্থাপন করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, চিকন ইটে নির্মিত দেয়ালে নকশা করা মসজিদটি সবার নজর কেড়েছে। তবে সংস্কারের অভাবে প্রাচীরগুলোতে ধরেছে ফাটল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেকোনো মুহূর্তে মসজিদটি ধসে পড়তে পারে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, জিন, ভূত, সাপ ও পোকামাকড় থাকার কারণে কেউ যেতে না পারায় পড়ে থাকে বেহাল অবস্থায়। বেশ কয়েক বছর আগে এলাকাবাসীসহ স্থানীয় মাদ্রাসাছাত্ররা মিলে চারপাশের ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালিয়ে নামাজ আদায়ের পরিবেশ তৈরি করে মসজিদটিতে। কিন্তু প্রাচীরে ফাটল দেখা দেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় মুসল্লিরা প্রাচীরের কাছে টিনশেড আর বেড়া নির্মাণ করে নামাজ আদায় করছেন। মসজিদটিকে ঘিরে স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকে বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগে থাকে বছরজুড়ে। তবে অযত্ন-অবহেলায় দীর্ঘকাল সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে বিলীনের পথে ঐতিহাসিক এই মসজিদটি।

এদিকে কয়েক বছর আগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় মসজিদটিকে ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করলেও তা কাগজ কলম আর সাইনবোর্ডে সীমাবদ্ধ। কর্তৃপক্ষ নেয়নি কোনো সংস্কারের উদ্যোগ। তাই এলাকাবাসীর দাবি দ্রুত মসজিদটি সংস্কার করার।

স্থানীয় মোকছেদুল ইসলাম জানান, ‘আমরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে নামাজ পড়ার উপযোগী করে তুলেছি কিন্তু দেয়ালের ফাটলের কারণে আতঙ্কে থাকতে হয় তাই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি পদক্ষেপ নিয়ে এই মসজিদটির সংস্কার করে তাহলে এটি হতে পারে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।‘

মসজিদ নিয়ে কথা হলে মছির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক আওকরা মসজিদ কবে নির্মাণ করা হয়েছে, তা আমার বাপ-দাদাও বলতে পারেনি। এটা অনেক আগের মসজিদ, এটা যদি সংস্কার করা না হয় তাহলে এই প্রাচীনতম নিদর্শন হারিয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের কথা ভুলে যাবে আগামীর ভবিষ্যৎ।’

অত্র মসজিদের মোয়াজ্জিন মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন মসজিদটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর স্থানীয়রা পরিষ্কার করে নামাজ আদায় করা শুরু করে। আশা করছি, সরকার দ্রুত মসজিটি সংস্কার করে দেবেন। তাহলে আমরা নিরাপত্তার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারব।’

অত্র মসজিদের সভাপতি মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘গ্রামবাসীর সহযোগিতায় আমরা মসজিদটি পরিষ্কার করে টিনের ছাউনি, মাইক ও নলকূপ স্থাপন করেছি। নামাজ আদায়ের উপযোগী করা হয়েছে মসজিদটি। তবে মসজিদটি দ্রুত সংস্কার না করলে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি ধ্বংস হয়ে যাবে।’

দিনাজপুর প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর ও কান্তজিউ মন্দিরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমান বলেন, মসজিদটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি পরিদর্শন করে সংস্কার করা হবে।

(কালবেলা)

– দিনাজপুর দর্পণ নিউজ ডেস্ক –