ব্রেকিং:
করোনায় আক্রান্ত হয়ে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামে আরো একজনের মৃত্যু। রংপুর নগরীতে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে জীবাণুনাশক স্প্রে করছে সিটি কর্পোরেশন।
  • বৃহস্পতিবার   ১৫ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২ ১৪২৮

  • || ০২ রমজান ১৪৪২

সর্বশেষ:
রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর এলাকায় র‌্যাব-১৩ এর উদ্যোগে করোনা সংক্রমণ রোধে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চলছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় সারাদেশে দ্বিতীয় দিনের মতো সর্বাত্মক লকডাউন চলছে। প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করছে সরকার বসুন্ধরার হাসপাতাল ‘উধাও’ হয়নি, বণ্টন হয়েছে- স্বাস্থ্যের ডিজি রংপুরসহ দেশের তিন বিভাগ ও দুই জেলার একাধিক স্থানে কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সর্বাত্মক লকডাউনের দ্বিতীয় দিনেও রংপুরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসেছে পুলিশের চেকপোস্ট।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: তার অবস্থান সবার আগে, সবার উপরে 

প্রকাশিত: ৬ এপ্রিল ২০২১  

বিভুরঞ্জন সরকারঃ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে তাকে নিয়ে কী লেখা যায় ভাবতে গিয়ে হাতের কাছে কয়েকটি বই পেয়ে যাই। এরমধ্যে বেশ মোটা মোটা বইও আছে। তবে হাতে তুলে নিলাম একটি ছোট সাইজের বই। বইটির লেখক আবুল ফজল। আবুল ফজলকে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবার আবুল ফজল কিছু সময়ের জন্য জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। তবে আবুল ফজলের মূল পরিচয় তিনি মুক্তচিন্তার বিবেকসম্পন্ন মানুষ। জিয়ার উপদেষ্টা থাকতেই বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘মৃতের আত্মহত্যা’ নামে একটি গল্প লিখে সাড়া ফেলেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আবুল ফজলের ছোট বইটির নাম ‘শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি’। এটা কোনো গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নয়, স্মৃতিচারণমূলক। সমাজ ও রাজনীতির একজন নিবিষ্ট পর্যবেক্ষক আবুল ফজল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার ব্যক্তিগত ভাবনাই বইটিতে তুলে ধরেছেন। বইটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার এক অশুভ উন্মাদনা তখন শুরু হয়েছে। মুজিবপ্রেমিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার লোক তখন খুব পাওয়া যায়নি। তার পক্ষে লেখা, তাকে নিয়ে লেখার মতো সাহসী বুদ্ধিজীবীও তখন কম। সেই রকম এক রুদ্ধ পরিবেশে আবুল ফজলের বইটি পড়ে আমি খুবই উজ্জীবিত হয়েছিলাম।

এখন সময় বদলেছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বইয়ের সংখ্যাও এখন কম নয়। বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা তিনটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং আমার দেখা নয়াচীন– বই তিনটি পড়লে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা অনেকটাই জানা হয়ে যায়। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহুকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ লুৎফর রহমান এবং সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে যে ‘খোকা’র জন্ম হয়েছিল, সেই শিশু একদিন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার গৌরব অর্জন করবে সেটা হয়তো তখন পিতা-মাতাও কল্পনা করেননি।

আবুল ফজল লিখেছেন:

বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও সর্বাধিক উচ্চারিত নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের তিনি শুধু নির্মাতা নন, প্রধান নায়কও। ঘটনাপ্রবাহ এবং নিয়তি তাকে বার বার এ নায়কের আসনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বলা যায়, যেন হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছে। তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের গত পঁচিশ বছরের ইতিহাস রচিত হতে পারে না। শত চেষ্টা করেও তাঁর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাস দেয় না তেমন কিছু করতে। ইতিহাস নিজের অঙ্গ নিজে করে না ছেদন। শেখ মুজিব ইতিহাসের তেমন এক অচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেরও। কারণ ইতিহাস অখণ্ড। সুনামে-দুর্নামে, অসাধারণ সাফল্য ও শোচনীয় ব্যর্থতার জন্য ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

আজকে যারা স্তাবকতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তারা হয়তো আবুল ফজলের লেখার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলবেন, বঙ্গবন্ধুর কোনো ব্যর্থতা নেই। তাদের উদ্দেশে শুধু বলবো, গভীর মনোযোগ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ুন। তিনি অকপটে বলেছেন, যিনি কাজ করেন তিনি ভুলও করেন। শেখ মুজিবও ভুল করেছেন। তবে ছোটখাট সেসব ভুল আঁকড়ে না থেকে তিনি বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করেছেন।

আবুল ফজল লিখেছেন:

তিনি (শেখ মুজিব) সম্পূর্ণভাবে বাঙালি চরিত্রের প্রতিভূ ছিলেন। ছিলেন বাঙালির সব রকম সবলতা-দুর্বলতার প্রতীক’।

হ্যাঁ, বেশিভাগ সবলতা এবং সামান্য মানবিক দুর্বলতা নিয়েই শেখ মুজিব ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের অসাধারণ মানুষ।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এখন দুরকমের আলোচনা হয়। কেউ কেউ এমন সব তোষামুদি কথা লেখেন যা আসলে বঙ্গবন্ধুকে বড় করে না। যারা তার সান্নিধ্যে এসেছেন তারা জানেন কী উষ্ণ হৃদয়ের তেজস্বী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ ছিলেন শেখ মুজিব। সেই বালকবেলা থেকেই তিনি সবার সঙ্গে থেকেও ছিলেন সবার থেকে আলাদা। নেতৃত্ব সহজাত গুণ ছিল তার মধ্যে সদা সক্রিয়। তিনি যেমন ছিলেন, তেমনভাবেই তাকে চিত্রিত করা উচিত। বাড়িয়ে বলার কোনোই দরকার নেই। মানুষের জন্য তার হৃদয়ে যে মমত্ব ও ভালোবাসা ছিল তা অকৃত্রিম। যারা তাকে ছোট করার জন্য কল্পগল্প ফাঁদেন তারাও মতলববাজ। অবশ্য শেখ মুজিব যেহেতু ইতিহাসের নির্মাতা সেহেতু তাকে নিয়ে বেশি বলা কিংবা কম বলার প্রবণতা সহসা দূর হবে না।

মেধাবী ছাত্র বলতে যা বোঝায় শেখ মুজিব হয়তো তা ছিলেন না। সারাক্ষণ বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকলে তিনি তো ইতিহাসের পাতায় নিজের স্থান করে নিতে পারতেন না। তবে তার মানে এটা নয় যে পঠনপাঠনে তিনি বিমুখ ছিলেন। রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন এমনকি গল্প কবিতারও তিনি অনুরাগী পাঠক ছিলেন। জ্ঞানী মানুষ আর কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। বঙ্গবন্ধুর কাণ্ডজ্ঞান অন্যদের থেকে বেশি এবং জীবনের বিস্তীর্ণ পাঠশালা থেকে উপযুক্ত শিক্ষা নিতে পেরেছিলেন বলেই তার সময়ের আর সব নেতাদের অতিক্রম করে পর্যায়ক্রমে তিনি মুজিব ভাই, শেখ সাহেব, বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি হতে পেরেছেন।

বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ এবং সুদূরপ্রসারী। সময়ের চেয়ে এগিয়ে ভাবতেন। কাকে দিয়ে কী কাজ করতে হবে সেটাও তিনি বুঝতেন। যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন তাদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর একটি দুর্বলতা ছিল। ১৯৬৯ সালে আবুল ফজলের একটি লেখা দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হওয়ার পর শেখ মুজিবের কাছ থেকে তিনি একটি চিঠি পেয়েছিলেন। ১৭ নভেম্বর, ১৯৬৯ তারিখে লেখা চিঠিতে আবুল ফজলেকে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,

জনাব অধ্যাপক সাহেব আমার ছালাম গ্রহণ করবেন। আশা করি ছহি-ছালামতে আছেন। সম্প্রতি ইত্তেফাকে আপনার ‘শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য’ পড়ে মুগ্ধ হলাম। আপনার সাবলীল লেখনী নিঃসৃত সৃজনশীল এই প্রবন্ধটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে অধিক সংখ্যক মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারলে নির্যাতিত মানুষের পরম কল্যাণ সাধিত হবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। প্রবন্ধটি আমি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করতে মনস্থির করেছি। আপনার অনুমতি পেলে কৃতার্থ হবো।

– আপনার স্নেহের শেখ মুজিব।

আবুল ফজলের সঙ্গে সেসময় শেখ সাহেবের সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না। আবুল ফজল আওয়ামী লীগ করতেন না। অথচ তার একটি লেখা পড়ে ভালো লাগায় তা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গরজ বোধ করেছিলেন। চিঠি লিখে তার অনুমতি চেয়েছেন। এই ছিল তার সৌজন্য বোধ। তখন কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে গেছেন। বাঙালি জাতি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে সমবেত হতে শুরু করেছে। মানী ব্যক্তিদের বঙ্গবন্ধু সম্মান করতেন। তাদের পরামর্শ তিনি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন। সম্মান পেতে হলে যে সম্মান দিতেও জানতে হয়– আজকাল ভূইফোড় রাজনৈতিক নেতাদের সে সহবত জানা নেই। তাই রাজনীতি থেকে সৌজন্য শিষ্ঠাচার প্রায় বিদায় নিয়েছে।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর আবুল ফজল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার স্মৃতি স্মরণ করে লিখেছেন:

৭-৫-৭৩।

আজ সন্ধ্যায় গণভবনে শেখ সাহেবের সাক্ষাৎকার। এ সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা আগে থেকেই করা। আগের দিন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডক্টর নূরুল ইসলাম ও অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও আমি দেখা করেছি। উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা। শেখ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্যও তাই।

দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে আলাপ। মনে হলো তিনি আজ বেশ খোশমেজাজে আছেন। ঘরোয়া রসিকতা থেকে রাজনীতি – কিছুই বাদ গেল না। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র রাসেলকেও দেখলাম ওখানে একা একা ঘুরঘুর করছে। বাপের সঙ্গে এসেছে গণভবনে। শিশুসুলভ উৎসাহ, কৌতূহল নিয়ে এ কক্ষ থেকে ও কক্ষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। হ্যাংলা শীর্ণ চেহারা, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটার বলেই বোধকরি দেখাচ্ছিল রোগা রোগা।

বললাম : বাপের স্বাস্থ্য পায়নি।

আমার এ মন্তব্যের পর উপস্থিত ওখানকার বয়স্ক এক সেবক বললো: চৌদ্দ-পনের হতে হতেই, দেখতে দেখতে ইয়া লম্বা হয়ে যাবে স্যার। ও হয়তো পুরনো লোক, দেখেছে শেখসাহেবের ছেলেরা প্রথমে রোগা-পটকা থাকলেও কৈশোরে পা দিতে না দিতেই লক লক করে বেড়ে ওঠে। স্বয়ং শেখসাহেবও নাকি প্রথমে তাই ছিলেন। চায়ের হুকুম হলো। চা এলো। চা খেতে খেতেই আলাপ চললো। বললেন, গত পনেরো মাস ধরে তিনি কোনো মাইনে নিচ্ছেন না। কেউই এখন জানে না। প্রচার করেননি কথাটা। স্ত্রীর কিছু আয় আছে। তাতেই সংসার চলে। নাস্তা করে সকাল নটায় গণভবনে আসেন আর রাত দশটা-এগারোটায় ফেরেন। দুপুরে খাবার পাঠিয়ে দেন বেগমসাহেবা বাড়ি থেকে।

পনেরো মাস বেতন নেননি বঙ্গবন্ধু অথচ তা প্রচার করেননি। এই ছিলেন বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

আবুল ফজল লিখেছেন :

– অপ্রাসঙ্গিক হলেও বললাম, ছেলেদের বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে ভালো শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন না কেন? এখানে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ভালো লেখাপড়া না হওয়ারই কথা।

উত্তরে তিনি ( বঙ্গবন্ধু) বললেন, দেখুন আমার ছেলেদের যদি আমি বিদেশে পাঠাই অন্যেরা কী করবে? দেশের সবার ছেলেমেয়েকে তো আর আমি বিদেশে পাঠাতে পারবো না।

কথাটা সত্য। এ সেন্টিমেন্ট প্রশংসারও যোগ্য।

এই যে নিজের ছেলেদের কথা শুধু না ভেবে সবার ছেলের কথা ভাবা – এমন নেতা আমরা আর কোথায় পাবো!

একদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে আবুল ফজল বলেছিলেন, ‘অনেক সময় স্বার্থান্বেষী অবুঝ আত্মীয়স্বজনেরা অসাধারণ প্রতিভাধর নেতৃত্বের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়… -ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে শেখসাহেব বলে উঠলেন, আমার একটা ভাগিনাই তো শুধু কিছুটা কাজকর্ম করছে। আমি তাকে বলে দিয়েছি একজনের পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব নয়। তুমি সাংবাদিকতাও করবে, একসাথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগও করবে – এ হয় না। দেখ না আমি সারাজীবন একটা ধরে ছিলাম বলে আজ এ অবস্থায় এসে পৌঁছেছি। তাকে আমি বারণ করে দিয়েছি।

এরকম আরো কিছু কথা, কিছু প্রসঙ্গ বইটিতে আবুল ফজল লিখেছেন যা মানুষ বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে সহায়তা করবে। এই বইটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা শুনি না। কেন? বুঝতে পারি না।

বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আবুল ফজল লিখেছেন

১৫ অগাস্টের ভোররাত্রির নির্মমতা কারবালার নির্মমতাকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে। কারবালায় দুপক্ষের হাতে অস্ত্র ছিল, তারা ছিল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর সে হত্যা কোনো অর্থেই ঠাণ্ডা রক্তে ছিল না। সৈনিকের পেশা শত্রু নিধন, আর হাতের অস্ত্র উত্তোলিত হয় শত্রুর বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে। সে যখন হত্যা করে, তখন সে তা নৈতিক নিয়ম-কানুনের আওতায় থেকেই তা করে। সৈনিক তো খুনি নয় – তার হাতের অস্ত্র নিরস্ত্র নিরপরাধের ওপর উদ্যত হয় না। অথচ ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবের বাড়িতে তা-ই ঘটেছে।

যিনি বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার গৌরবের অংশীদার করলেন তাকে হত্যা করা হলো রাতের অন্ধকারে।

আবুল ফজল লিখেছেন:

শেখ মুজিব না থাকাটা যে বাংলাদেশের জন্য কত বড় শূন্যতা তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তিনি ছিলেন সারা দেশের সামনে ঐক্যের প্রতীক এবং ঐক্য রক্ষাকারী এক মহাশক্তি। সে প্রতীক, সে শক্তি আততায়ীর গুলিতে আজ ধুলায় লুণ্ঠিত। এ নির্মম ঘটনায় যন্ত্রণাবিদ্ধ আমরা সবাই। সে যন্ত্রণা ভাষার অতীত। তাই তার বহিঃপ্রকাশ নেই কোথাও। সবাই ছটফট করছে ভিতরে ভিতরে। বিবেকী মানুষদের বিবেক কাতরাচ্ছে অহরহ।

আবুল ফজল আরও লিখেছেন,

শেখসাহেবের একজন নিকট-প্রতিবেশী এ বলে আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন-প্রতিবেশীর প্রতি যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তা আমি পালন করতে পারিনি। সে কর্তব্য অতি সামান্য। প্রতিবেশীর মৃত্যু হলে তাঁর দাফন-কাফনে সহায়তা করা, জানাজায় শরিক হওয়া। সেটুকু আমি করতে পারিনি। এ বেদনা আমাকে সারা জীবন বইতে হবে। ইতিহাস কাউকে মার্জনা করে না।

আজ এটা বলা যায়, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে যারা তাকে ইতিহাসে থেকে বাতিল করতে চেয়েছিল, তাদের ঠাঁই আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য কিছু ভাবেননি। তিনি তাই আজ গৌরবের, শ্রদ্ধার এবং সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর বহুমাত্রিক ভূমিকা, অবদান যত দিন যাবে তত আরো বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। রাজনীতিতে, ইতিহাসে, জাতীয় জীবনে তাঁর অবদানের সঙ্গে কারো তুলনা বাতুলতামাত্র, তাঁর অবস্থান সবার আগে, তিনি সবার উপরে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

– দিনাজপুর দর্পণ নিউজ ডেস্ক –