ব্রেকিং:
রংপুর প্রেস ক্লাবের দ্বি-বার্ষিক (২০২১-২০২৩) নির্বাচনে সভাপতি পদে দৈনিক যুগান্তরের রংপুর ব্যুরো প্রধান মাহাবুব রহমান হাবু ও সাধারণ সম্পাদক পদে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার রফিকুল ইসলাম সরকার বিজয়ী হয়েছেন।
  • সোমবার   ০২ আগস্ট ২০২১ ||

  • শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮

  • || ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

সর্বশেষ:
শোকাবহ আগস্ট: বাঙালির শোকের মাস শুরু পোশাক কারখানা খুলছে আজ, যে ১৫ শর্ত মানতে হবে মালিকদের গ্রামে আটকে পড়া পোশাক শ্রমিকদের চাকরি যাবে না গণটিকা কার্যক্রম সফল করতে সবাই টিকা নিন লালমনিরহাটে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে খাদ্য সহায়তা বিতরণ

রংপুরে দিন দিন বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যান

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২১  

রংপুরে দিন দিন বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যান। বিষয়টি নতুন না হলেও করোনাকালে আগের চেয়ে বিচ্ছেদের হার বেড়েছে অনেক বেশি। প্রতি মাসে দেড় শতাধিকের বেশি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনপত্র জমা পড়ছে। মাসে গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

গেল এক বছরে রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) এলাকায় সহস্রাধিক বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। মহানগরের বাইরে জেলার বাকি আট উপজেলাতেও হরহামেশাই ঘটছে এ রকম ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদের এ তকমায় এগিয়ে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা। রয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও। যাদের গড় বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর। রসিকের সাধারণ শাখা থেকে এমন তথ্যই দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি জুন পর্যন্ত মহানগর এলাকার ৩৩ ওয়ার্ডে ৯৬০টিরও বেশি বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। তালাক দেওয়ার তালিকায় নারীরা একধাপ এগিয়ে রয়েছেন। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নারীরা এখন অনেক বেশি হারে তালাক দিচ্ছেন বলে জানান রসিকের সাধারণ শাখার উচ্চমান সহকারী নাইমুর হক নাইম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর সিটির বর্ধিত এলাকা ছাড়াও শহরের কমবেশি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, শ্রমজীবী-চাকরিজীবীসহ যেকোনো পেশার মানুষ পারিবারিক অশান্তি, বিরোধ-কলহের জেরে সাংসারিক সম্পর্কের সমাপ্তি টানছেন।
বিচ্ছেদের এই তালিকায় যৌতুক নিয়ে বিরোধ, পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিয়ে, পালিয়ে বা প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বিয়ে, কারো প্ররোচনায় পড়ে বিয়ে এবং অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে করা ছেলে-মেয়েরা রয়েছে। যাদের বেশিরভাগই উঠতি বয়সের এবং স্কুল-কলেজ পড়ুয়া। এছাড়াও বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ রয়েছেন।

পুরাতন রংপুর শহরের মাহিগঞ্জ এলাকার বিচ্ছেদ হওয়া এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিম্নআয়ের পরিবার আমার। অভাবের কারণে পড়ালেখাও তেমন করা হয়নি। অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিল পরিবার। বিয়ের সময়ে ছেলের পক্ষ থেকে চার লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেছিল। আমার বাবা দেড় লাখ টাকা যৌতুক দিয়ে আমাকে বিয়ে দেন।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু বাকি টাকার জন্য সবসময়ই খটকা দিত শ্বশুরবাড়ির লোকজন। যৌতুকের টাকা না দিতে পারায় স্বামী আমাকে মারধর করত। বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তালাক দিতে বাধ্য হয়েছি। এখন একটা সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আছি। আর বিয়ে করব না, ভাগ্যে যা ছিল হয়েছে।

নগরের তামপাট তালুকহাবু এলাকার এক কৃষকের মেয়ে জানুয়ারির দিকে তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। কিন্তু ৩ মাস পার না হতেই সংসার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। দুজনের অপ্রাপ্তবয়স আর দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

বিচ্ছেদের অনলে পোড়া ওই তরুণী নাম না প্রকাশের অনুরোধে বলেন, স্বামী নেশা করত এবং বেকার ছিল। প্রেমের সম্পর্ক ধরে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর থেকে ভিন্ন আচরণ শুরু করে। নেশার টাকার জন্য আমাকে নির্যাতন করত। টাকার জন্য কিছুদিন পর পর বাবার বাসায় পাঠিয়ে দিত।

তিনি আরও বলেন, এ রকম অত্যাচার সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সম্ভব হয়নি। বাবা-মার অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করে জীবনে এমন যন্ত্রণা নেমে এসেছিল বলে মনে করছেন উঠতি বয়সের এই তরুণী।

নগরের কামারপাড়া এলাকার এক চাকরিজীবী পুরুষ। কয়েক মাস আগে তার স্ত্রী তাকে তালাক দিয়ে অন্যত্রে আবার বিয়ে করেছেন। এই ব্যক্তি নিজের নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, তার স্ত্রী যৌথপরিবারে থাকতে রাজি ছিলেন না। দুজনের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য ছিল। তারপরও চেষ্টা করেছেন সংসার টিকে রাখার। কিন্তু স্ত্রীর অবাধ চলাফেরা, চিন্তাধারায় ভিন্নতা এবং আলাদা থাকার প্রবল ইচ্ছার কারণে সংসারে অশান্তি লেগে ছিল। শেষ পর্যন্ত মানিয়ে নিতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়।

এদিকে বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার জন্য পারিবারিক অশান্তি, পরকীয়া এবং নারী নির্যাতনকে দুষছেন রংপুর মহানগর কাজী সমিতির সভাপতি হাফিজ মুহাম্মদ আব্দুল কাদির। তিনি জানান, অবাধ স্বাধীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, মাদকাসক্ত, পরকীয়া আসক্তি, স্বামী-স্ত্রীর মতামতের পার্থক্য, যৌতুক, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে।

সবকিছুর মূলে যৌতুক, পরকীয়া, শারীরিক নির্যাতন, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হওয়াটা বিচ্ছেদের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন এই কাজী। সঙ্গে ভারতীয় সিরিয়ালও সংসার জীবনে বিচ্ছেদের ঘটনায় নারী-পুরুষদের প্রভাবিত করছেন বলে দাবি তার। তিনি বলেন, অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বিচ্ছেদের প্রবণতা বেড়েছে। এতে পুরুষদের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি।

রংপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মাহমুদুল ইসলাম রানা বলেন, সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দিন দিন বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে। যদিও বিবাহবিচ্ছেদ রাষ্ট্রীয় আইন ও ব্যক্তিগত আইনসম্মত একটি পদ্ধতি। তবে এটি বেদনাদায়ক। এই চর্চার ব্যাপকতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে এটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হবে।

– দিনাজপুর দর্পণ নিউজ ডেস্ক –